সৃজনশীল পরিবার পেতে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করুন

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ৮ জুলাই, ২০২১
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

আমি বাংলাদেশের একজন অতি সাধারণ পরিবারের ছেলে। বাবা-মা কৃষি এবং চাকরি দুটোর সমন্বয় ঘটিয়ে আমাদের শিক্ষা, সঙ্গে ভালো সৃজনশীল মানুষ হতে সাহায্য করেছেন। পরিবারের সবাই কমবেশি শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, সত্ত্বেও পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে আমরা পরস্পর মেলামেশা করা বন্ধ করে দিয়েছি। তাছাড়া সবাই দেশের বাইরে থাকার কারণে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।

পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান নেই বললেই চলে। আমরা সবাই চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি, হিংসা-বিদ্বেষে মন ভরে গেছে, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে লোভ যা আমাদের গ্রাস করে চলেছে। দুঃখের বিষয় যখন অর্থনৈতিক সচ্ছলতা কম ছিল তখন ভালোবাসা ছিল, এখন সব থাকতেও কিছু নেই। বলতে গেলে দেহ আছে প্রাণ নেই, মাথা আছে ঘিলু নেই।

আমাদের ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে সুশিক্ষার অভাব আর লোভ প্রলোভনের কারণে এই অধঃপতন। তাছাড়া আমাদের মধ্যে জন্মেছে ইগো এবং রাগ। রাগের কারণে দ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্বের কারণে যার যা খুশি তা করতে দ্বিধাবোধ করছি না। এখন এই রাগ এবং দ্বন্দ্ব হচ্ছে নেতিবাচক অনুভূতি। এর আবার রয়েছে নানা ধরনের প্রকাশভঙ্গি।

মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য, তর্ক, দ্বন্দ্ব, মান-অভিমান ইত্যাদি থেকে রাগের উদ্রেগ হয়। এগুলোর কোনোটাই অস্বাভাবিক নয়। তবে সমস্যা হচ্ছে, কীভাবে তা প্রকাশ করা হয় এবং কী ঘটে এর প্রেক্ষিতে। বাংলাদেশে পরিবার হচ্ছে একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। বিয়ে শাদির পর পরিবার তার রূপ পাল্টায়।

যার ফলে পরিবার দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। পরিবার একটি জায়গা যেখানে মানুষ তার মনের কথাগুলো মন খুলে বলতে পারে। নিজের মতামত রাখতে পারে, নিজের কতটুকু মূল্য আছে তা বুঝতে পারে। যৌথ পরিবারে কিন্তু আমাদেরই করা কিছু ছোট ছোট ভুল আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। পরস্পরের সৃষ্ট সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়।

অপমান এবং সমালোচনা পরিবারের নির্দিষ্ট কোনো মানুষকে ঘিরে যখন করা হয় তখন অন্যরাও এই ক্ষেত্রে সাহস পেয়ে যায়, ফলে তারা তাকে অপমান করতে শুরু করে। এভাবে একজনের দেখাদেখি অন্যরাও একে অন্যকে নিয়ে অপমান সমালোচনা করা শুরু করে। আর পরিবারে দেখা দেয় ফাটল।

পেছনে কথা বলা, কারো পেছনে যখন কেউ কথা বলে তখনই পরিবারে দেখা দেয় নানা সমস্যা, যেমন একে অন্যকে সন্দেহ করে। কাউকে বিশ্বাস না করা এরই অংশ। যার ফলে একটা পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। আন্তরিকতার সাথে একটি পরিবারে নতুন মানুষ যুক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। তাকে ঘিরে থাকবে অনেক মানুষের অনেক মত।

কিন্তু সে যদি সবার সাথে আন্তরিক না হতে পারে, ভালোভাবে মিশতে না পারে তবে সমস্যা সেখান থেকেই শুরু হয়। দেখা যায় এরা অন্য বাজে মানসিকতার মানুষগুলোর সাথে মিশে যায় আর পরিবারে দেখা দেয় নানা সমস্যা। প্রতারণা এবং মিথ্যা একটা সম্পর্ককে যেমন নষ্ট করে ফেলতে পারে তেমনি একটি পরিবারকেও।

পরিবারের কেউ যদি একবার মিথ্যা বলা শুরু করে তাহলে সবাই ভুল তথ্য পেতে থাকবে। আর ধীরে ধীরে সবার মাঝে তৈরি হবে ভুল বুঝাবুঝি, শুরু হয় দ্বন্দ্ব। যা একটি হাসিখুশি পরিবারের সুখ নষ্ট করতে যথেষ্ট।

দ্বন্দ্বের কারণে দণ্ড, দ্বন্দ্বের কারণে সম্পর্ক নষ্ট বা দ্বন্দ্বের কারণে ডিভোর্স পর্যন্ত হয়ে থাকে। দ্বন্দ্ব একটি শব্দ যার ভূমিকা পরিবার, সমাজ, দেশ বা বিশ্বে অপরিসীম। এখন প্রশ্ন হঠাৎ করেই কি দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হয় নাকি কোনো কারণবশত এর উৎপত্তি হয়? every action has an reaction —তাহলে রিয়াকশন হতে পারে দ্বন্দ্বের কারণ।

ছোটবেলায় ভাই-বোনের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধে। দেখা গেল বিনা কারণে একজন আরেক জনের সঙ্গে ইয়ারকি- ফ্যাজলামি করছে হঠাৎ প্রতিপক্ষের মন খারাপ হয়ে গেল তাতে করে শুরু হলো দ্বন্দ্ব। ছোটদের দ্বন্দ্বে অনেক সময় বড়দের হস্তক্ষেপের কারণ ঘটে যার ফলে দ্বন্দ্ব ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

দ্বন্দ্ব পুঁথিগত শিক্ষার মাধ্যমে কেউ শেখে না। তারপরও ছোট-বড়, শিক্ষিত-অশিক্ষিত বলে কথা নেই, পৃথিবীর সর্বস্তরে এর উপর চর্চা চলছে। সমাজে যেসব জিনিস নিয়ে বেশি কথা হয় যেমন বলা হয় মিথ্যা কথা বলা ভালো নয়, দেখা যায় সেটাই বেশি করে বলা হয়। দ্বন্দ্ব দৈনিক শিক্ষার একটি বিশেষ অংশ যা প্রতিনিয়ত ঘটে, পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে।

দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করার জন্য খুব অল্প সময় ব্যয় করা হয় বরং দ্বন্দ্ব যাতে লেগে থাকে তার উপর সমাজের একটি উসকানিমূলক প্রভাব রয়েছে, যার ফলে দ্বন্দ্ব বেশির ভাগ সময় দন্ডে পরিণত হয়।

দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনে পারিবারিক ও সামাজিক মহলে নীতি, পারস্পরিক ও পেশাগত সম্পর্কের উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতা একটি বড় নিয়ামক। ক্রমবর্ধমান ও দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব-সংঘাতে দু’পক্ষের শক্তিরই অপব্যবহার হয়, সম্পদ নষ্ট হয় এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় বিরূপ প্রভাব পড়ে। অপরপক্ষের সঙ্গে খোলামনে বসে মতপার্থক্য নিরসন করার এই কৌশলটি প্রায়ই ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, সবক্ষেত্রেই একজন রাগের সময়ে কী বলে, তার চেয়ে কীভাবে বলে, সেটা বেশি গুরুত্ব পায়। তাই প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট দ্বন্দ্ব ও ঝগড়ার প্রকাশ কীভাবে হচ্ছে, সেদিকে খেয়াল রেখে আমার এই লেখা। আমি আমার পরিবারের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরলাম এই কারণে যে, কেউ এর থেকে কিছু শিক্ষা লাভ করতে পারে এবং কিছু উপকৃতও হতে পারে।

প্রথমে সবারই একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, রাগ বা অভিমান তার ওপরই করা যায়, যার অধিকারবোধ রয়েছে। পরিবারের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। এই সময়ে বিষণ্নতা পরিবারের সবারই মানকে কমিয়ে দিয়েছে এবং সবার ব্যক্তিত্বের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ভাবছি কী করা যেতে পারে যখন এমনটি অধঃপতন?

আমি নিজে কিছু বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়ে চলছি। যেমন রাগের মাত্রা বেশি বেড়ে গেলে শুধু ঠোঁট নয়, চোখ আর কানও বন্ধ করে ফেলি। এটা সত্যিই কার্যকর। যে আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছে বা যা নিয়ে আমি রেগে যাচ্ছি, কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে সেখান থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। যেন আমি সেখানে থেকেও নেই। প্রয়োজনে স্থান ত্যাগ করে অন্য কোথাও গিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে হেডফোনে গান শুনি বা নিজেই গান গাই।

নিয়মিত একটু সময়ের জন্য মেডিটেশন বা ধ্যান করার চেষ্টা করি। তারপর যদি কারও আকস্মিকভাবে রেগে যাওয়ার রোগ থাকে সেটাও সেরে যেতে পারে নিয়মিত ধ্যানে। ধ্যানের ফলে আপনার ব্যক্তিত্ব আরও শক্তিশালী হবে।

শরীরচর্চা রাগ কমানোর আরও একটি কার্যকরী উপায়। শরীরচর্চার ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। এ ছাড়া নিয়মিত শরীরচর্চায় একজন মানুষের যে খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে, তা সুস্থ জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। পরিবারের সদস্য আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো যেতে পারে।

প্রতিদিনের কর্মঘণ্টাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে আমাদের কোনো কাজে তাড়াহুড়ো না হয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু সময় ব্যায়াম বা খেলাধুলা করা উচিত, প্রচুর পানি আর শাকসবজি খেতে হবে। দিনের বেলা শুয়ে থাকা চলবে না। মোবাইলে বেশি সময় দেয়া যাবে না। এরপরও যদি বিষণ্নতা থাকে, তবে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ করার প্রয়োজন হতে পারে।

সবশেষে বলবো, পরিবারের যে মানুষটি আপনাকে ছেড়ে গেছে বা আপনাদের সঙ্গে সম্পর্ক আর নেই, সেই মানুষকে ক্ষমা করুন। নিজের ভুলের কারণে যদি এমনটা ঘটে থাকে, তবে নিজেকেও ক্ষমা করে শুধরে উঠুন। কারণ বিচ্ছেদের জ্বালা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে ক্ষমার চেয়ে বড় কোনো ওষুধ নেই।

যেদিন ক্ষমা করতে পারবেন, সেদিনই দেখবেন কতটা হালকা লাগছে নিজেকে, কতোটা প্রফুল্ল লাগবে মন এবং ধীরে ধীরে অতীতগুলোও ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন। এ ধরণের প্রাক্টিস সবাইকে করতে হবে, নইলে পরিবারকে একত্রে করা সম্ভব হবে না। পারিবে না এ কথাটি বলিবে না আর, একবারে না পারিলে দেখো শতবার।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com

বন্ধুকে সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও যা পড়ে দেখতে পারেন
kidarkar
Copyright © 2021 All rights reserved www.mediamorol.com