kidarkar

মামু টাহা আনছ, টাহা আনলে কাম অইব!

বাংলাদেশ

হাসান রাফি | ১৯ ডিসেম্বর ২০২০, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন

“মামু টাহা আনছ, টাহা আনলে কাম অইবে, না আনলে অইবে না, আনলে ফি’ঙ্গার দাও” কিংবা ‘ঘু’ষ খাই’লে কী হয়, জে’ল হয়, ফাঁ’সি তো আর হয় না’ এভাবেই বেশ রসকষ মি’শিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষে আসা সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ চাইতেন প্রতিষ্ঠানটির সহকারি পরিচালক আইয়ুব আনসারি। মোটা অংকের টাকা’র বিনি’ময়ে অদক্ষ, অনুপযুক্ত চালকদের দিতেন রাস্তায় মানুষ মা’রার লাই’সেন্স।

এমনকি রো’হি’ঙ্গাদেরকেও একই কা’য়দায় দি’য়েছেন বাংলাদেশের সড়কে দাপিয়ে বেড়ানোর অনুমতি পাওয়ার সুযোগ। যা দিয়ে পরবর্তীতে তারা পাসপোর্ট করে হয়ে গেছেন বাংলাদেশের নাগরিক। একসময় বিআরটিএর দালাল হিসাবে কাজ করা আইয়ুব সুযোগ পেয়ে যান প্রতিষ্ঠানটির কারিগরি সহকারি হিসাবে কাজ করার।

সেখান থেকে কতিপয় দু’র্নীতি’বাজ কর্মকর্তাদের হাত করে ২০১১ সালে অস্থা’য়ীভাবে দায়িত্ব পান প্রতিষ্ঠানের মোটরযানের পরিদর্শকের। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দু’র্নী’তির চ’রম পর্যায়ে গিয়েও তিনি বর্তমানে বনে গেছেন বিআরটিএ’র বরিশাল বিভাগের সহকারী পরিচালক।

বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, ২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল এই ৩ বছরে বিআরটিএ’র কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া কার্যালয়ে গাড়ি নিবন্ধনের সরকারি কর ও ফি বাবদ ৪ কোটি ৩৬ লাখ ৪৩ হাজার ৬০০ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে নিজের পকেটে ঢুকিয়েছিলেন তখনকার উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। সেই দলে ছিলেন আইয়ুব আনসারিও।

অর্থ আত্মসাতের এই ঘটনা ধামাচাপা দিতে ইকুরিয়া বিআরটিএ কার্যালয় থেকে দেড় হাজারেরও বেশি গাড়ির নথি গায়েব করে দেন তারা। সুত্রটি আরও জানান, আইয়ুবের মত আরও অন্তত ২৪ জন কর্মকর্তা সরকারের এই দপ্তরে দুর্নীতির জাল পেতে বসেছেন। যাদের মাধ্যমে ভূয়া নথিপত্রও সঠিক বলে চালিয়ে গাড়ি নিবন্ধিত হচ্ছে অগণিত।

২০১১ সালে সিনিয়র দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কাছ নেওয়া তালিমের মাধ্যমে বরিশালের ভোলা সার্কেলের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে শুরু করেন তার অপকর্ম। ওই সময় বিক্রয় নিষিদ্ধ রেঞ্জ রোভার গাড়ির নিবন্ধন দেন তিনি। কার্নেট ডি প্যাসেজ সুবিধায় এই গাড়িটি দেশে আনা হয়েছিল। ২০১০ সালের ১২ মার্চ বৃটেনের পাসপোর্টধারী ফরিদ নাবির নামে এক ব্যক্তি বাংলাদেশে নিয়ে আসেন গাড়িটি।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে (বিল অব এন্ট্রি-১০৪৫৯৯১ তারিখ-১২.১২.২০১১) ১৩০ শতাংশ শুল্ক দিয়ে ভোলা বিআরটিএ অফিস থেকে গাড়িটি নিবন্ধন করা হয়। আর এই গাড়িটির মালিক দেশের বহুল আলোচিত ব্যক্তি মুসা বিন শমসের। গাড়িটির নিবন্ধন নং- ভোলা-ঘ-১১-০০৩৫।

সরকারকে অজ্ঞাত কারণে তোয়াক্কা না করা এই কর্মকর্তা বিআরটিএ ভোলা সার্কেলে একরকম রাজত্বই করেছেন। ড্রাইভিং টেস্ট না করে, ভুয়া ভলিয়ম ও জাল বোর্ড রেজুলেশনের মাধ্যমে অন্তত ১২ হাজার ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েছেন তিনি। আর এই কাজের বিনিময়ে অন্তত ১০ কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেছেন আইয়ুব।

এটাই তার দুর্নীতির শেষ ঘটনা নয়। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলাসহ চট্টগ্রাম সিটির জাল নাগরিক সনদ ব্যবহার করে দিয়েছেন ২ হাজার রোহিঙ্গার ড্রাইভিং লাইসেন্স। যারা এই ড্রাইভিং লাইসেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এমন ভয়ানক অভিযোগ বিআরটিএতে মুখে মুখে রটে গেলেও অজ্ঞাত কারণে কোনো কর্মকর্তা এ বিষয়ে টুঁ শব্দটিও করেনি।

ভোলা সার্কেলে কয়েকশ ভুয়া কাগজপত্র সাজিয়ে ট্রাক ও পিকআপের নিবন্ধনও দিয়েছেন আইয়ুব আনসারি নামের দুর্নীতির এই মহাসাগর। তখন তিনি সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক ও সহকারি পরিচালক দুই দায়িত্বই পালন করছিলেন।২০১১ সালের ২৩ মার্চ মাদারীপুরের মশিউর রহমান ঠাকুর নামে এক ব্যক্তির ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাসটি (ঢাকা মেট্রো-চ-১৩-৩১৫০) চুরি হয় মানিকগঞ্জের শিবালয় থেকে।

চুরির ঘটনায় ওইদিনই গাড়িটির চালক শাহজাদা শিকদার শিবালয় থানায় জিডি করেন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো একই চেসিস নাম্বারের ১টি মাইক্রোবাস বরিশাল বিআরটিএ অফিস থেকে ‘বরিশাল ছ-১১-০০৩৯’ নাম্বারে নতুন রেজিস্ট্রেশন পায়। আইয়ুব তখন এই সার্কেলের মটোরযান পরিচালকের চলতি দায়িত্বে ছিলেন।

তিনিই এই গাড়িটির মালিক রূপ কুমার বিশ্বাসের দাখিলকৃত সকল কাগজ সঠিক ও বৈধ বলে প্রত্যয়ন করেন। আর এই সুপারিশে তখনকার পরিচালক নূরুজ্জামানও চোরাই গাড়িটির নিবন্ধন বেশ সহজেই দিয়ে দেন। এই ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ালে চলতি বছরের ৩০ নভেম্বর বরিশাল বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. মহিসন উল হকের আদেশে কারাগারে যান দুর্নীতির মহাসাগর খ্যাত এই আইয়ুব আনসারি।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ঝালকাঠি সার্কেলের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েও তিনি বেশ বুক ফুলিয়ে দুর্নীতি চালিয়ে গেছেন। ২০১৯ সালের ৪ জুলাই ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে কক্সবাজারের দুই ব্যক্তিকে সন্দেহজনকভাবে ঘুরতে দেখা যায়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন এনডিসি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ বসির গাজী।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই দুই ব্যক্তি জানায়, ‘তারা কক্সবাজার থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে ঝালকাঠি বিআরটিএ অফিসে এসেছেন।’ এতে সন্দেহ আরও ঘণীভূত হয় ম্যজিস্ট্রেটের। সাথে সাথে জেলা প্রশাসককে জানিয়ে অভিযান চালান বিআরটিএ কার্যালয়ে। আটক করেন ১১ গ্রাহক ও ২ দালালকে।

তারা সবাই মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে আইয়ুব আনসারির কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স করাতে যায়। তখন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৩ জনকে সাজা দিয়ে দুর্নীতির আখড়া আইয়ুব আনসারির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে জানানো হয়।

অভিযোগ জানানো হয়, তিনি অবৈধ ভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করে প্রায় ৬ কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। এই অভিযোগের পরেও যে সার্কেলে তিনি ছিলেন সেই সার্কেলে ঝালকাঠি-ড-১১-০০২২, ঝালকাঠি-ন-১১-০২৩২, ঝালকাঠি-ড-১১-০১২৫ নম্বর গাড়ি সহ ১২ টি চট্টগ্রামের স্থানীয় গ্যারেজে তৈরী করা গাড়িকে নিবন্ধন দেয় আইয়ুব আনসারী।

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • *
  • এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আরও খবর

    kidarkar