kidarkar

পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম মসজিদ সিলেটে!

ধর্ম ও জীবন

হাসান রাফি | ২৮ অক্টোবর ২০১৯, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ০৫:১১ অপরাহ্ন

ই’মামের পিছনে একটি মাত্র সারি। যেখানে চাপাচাপি করে দাঁড়াতে পারেন মাত্র সাতজন মু’সল্লি। পৃথিবীতে এরকম ছোট ম’সজিদের আরো নিদর্শন আছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেগুলো ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। তাই নামাজ পড়ার উপযোগী হিসেবে এ ম’সজিদটিই বিশ্বের ক্ষুদ্রতম ম’সজিদ।
উপজে’লার পর্যটন স্পট পান্তুমাই যাওয়ার পথে আরকান্দি বাজার সংলগ্ন কালাইউরা গ্রামবাসীদের কাছে এটি ‘গায়েবি ম’সজিদ’ নামে পরিচিত। অনেকে আবার ম’সজিদটিকে ‘এক ডিমের ম’সজিদ’ও বলে থাকেন।

প্রাচীন স্থাপত্য শৈলীর এই ম’সজিদ রক্ষায় স্থানীয়রা সচেতন রয়েছেন। তবে ম’সজিদের কোনো ফান্ড না থাকায় এই গ্রামের অস্বচ্ছল মানুষ ম’সজিদটিকে রক্ষণাবেক্ষণের তেমন কোনো কাজ করাতে পারেন না। এর আগে ইউপি চেয়ারম্যান ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করে ম’সজিদটিতে রঙের কাজ করান।

ম’সজিদটি ছোট হলেও এতে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্যের ছাপ। উত্তর-দক্ষিণে ৩.৮৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও পূর্ব-পশ্চিমে ২.৯৫ মিটার প্রস্থের এ ম’সজিদের স্থাপত্যশৈলীও অ’পূর্ব। ম’সজিদের চারকোণে রয়েছে মিনারের মতো চারটি স্তম্ভ। এগুলোকে ক’র্তার টাওয়ার বা বুরুজ বলা হয়। ছাদ ভেদ করে সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে এই বুরুজগুলো। আবার বুরুজের চূড়ায় রয়েছে কলস ও ফুলকুড়ি নকশা। এগুলোর গায়ে কার্ণিসের প্রায় দুই ফুট নীচে বলয়াকৃতির একটি রিং ছাড়া বিশেষ কোনো কাজ নেই। মিনারের অগ্রভাগে তিনটি কার্নিশ আছে এবং উপরে কলার থোড় আকৃতির কারুকাজ দেখা যায়।

পশ্চিমের দেয়ালের বাইরে মধ্যখানে মেহরারের অংশটি চৌকাণাকৃতি এবং সাদাসিধে সোজা ভূমি থেকে উপরের ছাদের সঙ্গে মিশে গেছে। বাইরে ম’সজিদের মূল ঘর থেকে উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে একটি দেয়াল আছে। মূল ঘর থেকে দেয়ালটি দক্ষিণ দিকে ২.৮৮ মিটার, পশ্চিম দিকে ১.৩৪ মিটার এবং উত্তর দিকে ১.৩৪ মিটার দূরে অবস্থিত। পশ্চিম দিকে দেয়ালের দৈর্ঘ্য ৮.৮৪ মিটার। দেয়ালের উচ্চতা ০.৭১ মিটার এবং পুরো দেয়ালের মধ্যে ৯টি মিনারাকৃতির খুটি আছে। প্রতিটি খুটির উচ্চতা ১.০৫ মিটার। প্রতিটি খুটির উপরে দৃষ্টিনন্দন মোটিফ আছে। ম’সজিদের পূর্ব দিকে খোলা বারান্দার মতো একটি স্থাপনা ছিল। যার কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে। বাইরের দেয়ালের পশ্চিমে লাগোয়া দুইটি কবরস্থানের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।

গ্রামবাসীর মতে, কয়েক বছর আগেও এগুলো সুন্দর কারুকার্যখচিত

দেয়ালঘেরা ছিল। দেয়ালের উপরে আস্তর করা বলে ভেতরের ইট দেখা যায় না। ম’সজিদ ঘরের চারদিকে বর্ধিত কার্নিশ আছে। এতে কোনো কারুকার্য নেই। দেয়ালের উপরে কার্নিশের নীচে দেয়ালের পুরুত্বের চেয়ে খানিকটা বড় কোণাকৃতি ভিম চারপাশে দেখা যায়। এতে কোনো বিশেষ কারুকার্য নেই।

লেখক ও গবেষক আব্দুল হাই আল হাদি তার একটি নিবন্ধে গোয়াইনঘাটের ‘এক ডিমের ম’সজিদ’কে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য কথিত ’ক্ষুদ্রতম ম’সজিদের’ সঙ্গে এ ম’সজিদের তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে যে, এটিই পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ম’সজিদ। যেটি এখনো ব্যবহারের উপযোগী আছে।

বাংলাদেশের বগুড়ার আদম’দিঘী উপজে’লার সান্তাহারের তারাপুর ম’সজিদকে অনেকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ম’সজিদ বলে দাবি করেন। এ ম’সজিদের উচ্চতা ১৫ ফুট, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ম’সজিদটি ১৫ বর্গফুট এবং দেয়ালের পুরুত্ব দেড় ফুট। ম’সজিদের প্রবেশ দরজার উচ্চতা ৪ ফুট এবং চওড়া মাত্র দেড় ফুট। অনুমান করা হয় যে, এখানে একসাথে মাত্র তিনজন মু’সল্লি নামাজ পড়তে পারতেন। কিন্তু এটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ভারতের হায়দারাবাদের কিসান বাগের ’জীন ম’সজিদ’কে অনেকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ম’সজিদ বলে দাবি করেন। ম’সজিদটি প্রায় ৪০০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। ম’সজিদটি হযরত সৈয়দ শাহ ই’মাদ উদ্দিন মোহাম্ম’দ আল-হোসাইনি যিনি মীর মাহমুদ কি পাহাদি নামেও পরিচিত। ম’সজিদটি বর্গাকৃতি এবং ভেতরের আয়তন ১০ বর্গমিটার।

এটি ভারতের ভূপালের ক্ষুদ্রতম ম’সজিদের চেয়ে ছোট যেটিকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ম’সজিদ বলে অ’ভিহিত করা হয়। এটিকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ম’সজিদের স্বীকৃতির জন্য প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে।

লেখক আব্দুল হাই এক ডিমের ম’সজিদটিকে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো বলে দাবি করেন। স্থাপত্যশৈলীর বিচারে ম’সজিদটি মুঘল আমলের অর্থাৎ ১৫৭৬ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত কোনো এক সময়ে নির্মাণ করা হয়েছে। অ’পরদিকে গোয়াইনঘাট ও মালনিয়াং রাজ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ম’সজিদ সংলগ্ন পুরো এলাকাটি বিহার সুবাহ’র অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময় বিহারের সুবেদার ছিলেন ইব্রাহিম খাঁ, তার মাজারটি ম’সজিদ হতে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

পশ্চিম জাফলং ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, ম’সজিদটি সংরক্ষণে সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আগের বছর তিনি ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করে ম’সজিদের রঙের কাজ করিয়েছেন। ফলে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে, সৌন্দর্য্য বেড়েছে। সরকারিভাবে এটিকে আরো ভালো’ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে।

ম’সজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোবারক আলী বলেন, কালাইউড়া (কেনাইকোনা) গ্রামের একাংশের মানুষ এই ম’সজিদেই নামাজ পড়েন। ম’সজিদের ধারণক্ষমতা মাত্র আটজন হওয়ায় সবাই ম’সজিদের ভেতরে নামাজ পড়তে পারেন না। ফলে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আম’রা ম’সজিদের সঙ্গে টিন দিয়ে একটি অংশ বাড়িয়েছি। সেখানে মহল্লার মানুষ নামাজ পড়েন।

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • *
  • এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আরও খবর

    kidarkar