বুয়েটে ভিসি-শিক্ষার্থী বৈঠকে যা হলো

বাংলাদেশ

rana miya | ১১ অক্টোবর ২০১৯, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৫৩ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের সব দাবি নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছে বুয়েট কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার বুয়েট অডিটোরিয়ামে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনাকালে বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

তবে দাবির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন না দেখে ভর্তি পরীক্ষা নয় বলে জানিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এর উত্তরে ভিসি জানান, ভর্তি পরীক্ষা শেষ হলে তাদের সকল দাবি বাস্তবায়ন করা হবে। এড়াছা ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য করার জন্য তিনি ছাত্রদের আন্তরিক সহযোগিতা চেয়েছেন।

বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম এর দেয়া ঘোষণাগুলো হলো-

বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুক্রবার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান বুয়েটের উপাচার্য ড. সাইফুল ইসলাম। ভিসি বলেন, আমি আমার ক্ষমতাবলে বুয়েট ক্যাম্পাসে সব ধরনের ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম। এখন থেকে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে ডিসিপ্লিনারি বোর্ডের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আবরারের বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে এবং মামলার খরচ বুয়েট কর্তৃপক্ষ বহন করবে।

এর আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ না করার পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) প্রশাসন চাইলে তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে বলে মত দেন তিনি।

১৯ শিক্ষার্থী বহিষ্কার: আবরার হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত বুয়েটের ১৯ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করার সিদ্ধান্তের কথা বৈঠকে শিক্ষার্থীদের জানান ভিসি ড. সাইফুল ইসলাম। তিনি আরো জানান, তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তাদের আজীবন বহিষ্কার করা হবে।

সরকারকে চিঠি: আবরার হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য আজ/কালকের মধ্যেই সরকারকে চিঠি দেয়া হবে জানিয়েছেন বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম।

অতীতের সব নির্যাতনের বিচার হবে: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) র‌্যাগিং বন্ধের ঘোষণা দিয়ে অতীতের সব ঘটনা তদন্ত করে বিচার করা হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। এছাড়া র‌্যাগিং বন্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে বুয়েট কর্তৃপক্ষ। তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্যাম্পাসের মধ্যে সিসিটিভি বসানো হবে। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন রয়েছে।

রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে যেতে পারবেন না বুয়েট শিক্ষকরা: এখন থেকে দেশের কোনো রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে যেতে পারবেন না বুয়েট শিক্ষকরা। ছাত্র রাজনীতি বন্ধের সাথে শিক্ষকদেরও রাজনীতি বন্ধে এমন ঘোষণা দেন ভিসি।

ভিসির ক্ষমা প্রার্থনা: বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের মৃত্যুতে নিজের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন ভিসি অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলাম। এছাড়া আবরার ফাহাদের জানাজায় উপস্থিত হতে না পারায়ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আমার কিছুটা ভুল হয়েছে, আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আবরার আমার সন্তানের মতো ছিল। তোমাদের যেমন কষ্ট লাগছে তার মৃত্যুতে আমারও অনেক খারাপ লেগেছে। এটি আমি মেনে নিতে পারিনি। তার মৃত্যুতে দুঃখ তোমরা পেয়েছ, আমিও পেয়েছি। আমরা সকলেই মর্মাহত। আমার কিছুটা ভুল হয়েছে, আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমার ভুল আমি স্বীকার করেছি, তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও।

এর আগে বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে উপাচার্য অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করেন। শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিভিন্ন অনুষদের ডিনরা বৈঠকে উপস্থিত রয়েছেন। বৈঠকের শুরুতে নিহত শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

শিক্ষার্থীরা জানান, বৈঠকে ১০ দফা দাবি ও আবরার হত্যার ঘটনায় উঠে আসা ইস্যুগুলো নিয়ে ভিসির কাছে জবাব চাওয়া হবে।

প্রথমে গণমাধ্যমের সামনে আলোচনা করতে রাজি না হলেও অনেক আলোচনা ও আন্দোলনের পর গণমাধ্যমের সামনে আলোচনা করতে রাজি হন উপাচার্য। তবে, আলোচনা সভা সরাসরি সম্প্রচার না করার শর্ত জুড়ে দেন উপাচার্য। উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করতে বুয়েটের বর্তমান শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী ছাড়া বহিরাগত ও অন্যদের প্রবেশ রুখতে বুয়েট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের গেইটে বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে তালা দেয় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেখে প্রবেশ নিশ্চিত করছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবির মধ্যে ছিলো- আবরার ফাহাদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজ ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুসারে শনাক্ত খুনিদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জড়িতদের শনাক্ত করে শুক্রবার বিকাল ৫টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার করতে হবে, মামলার সব খরচ এবং আবরারের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে। শুক্রবার বিকাল ৫টার মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিশ জারি করতে হবে; দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্পতম সময়ে আবরার হত্যা মামলার নিষ্পত্তি করার জন্য বুয়েট প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বুয়েট প্রশাসনকে সক্রিয় থেকে সমস্ত প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত ছাত্রদের তথ্য দিতে হবে; আবরার হত্যা মামলার অভিযোগপত্রের কপি অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে হবে; বুয়েটে ‘সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি’ নিষিদ্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে যাননি এবং ৩৮ ঘণ্টা পর উপস্থিত হয়ে কেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেছেন, কেন তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থান ত্যাগ করেছেন, তাকে ক্যাম্পাসে এসে জবাবদিহি করতে হবে; আবাসিক হলগুলোয় র‌্যাগের নামে এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সকল প্রকার শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং এ ধরনের সন্ত্রাসে জড়িত সকলের ছাত্রত্ব প্রশাসনকে বাতিল করতে হবে। একই সাথে আহসানউল্লাহ হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোয় জড়িত সকলের ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে; আগে ঘটা এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ এবং পরবর্তীতে তথ্য প্রকাশের জন্য একটি কমন প্লাটফর্ম হিসেবে কোনো ওয়েবসাইট বা ফর্ম থাকতে হবে এবং নিয়মিত প্রকাশিত ঘটনা রিভিউ করে দ্রুততম সময়ে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই প্লাটফর্ম হিসেবে বুয়েটের বিআইআইএস একাউন্ট ব্যবহার করতে হবে। ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শন করতে হবে এবং পরবর্তী ১ মাসের মধ্যে কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সবগুলো হলের প্রত্যেক ফ্লোরের সবগুলা উইংয়ের দুই পাশে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে; রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে নীরব থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে।

প্রসঙ্গত ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় খুন হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জের ধরে রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা। তবে আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা।

হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলেট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন।

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ইতিমধ্যে পুলিশ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন। ১৩ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন- (সকলেই বহিষ্কৃত) বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন, অনীক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশারেফ, বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন, গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে মুন্না, ছাত্রলীগের সদস্য মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর, মোহাজিদুর রহমানকে, শামসুল আরেফিন, মনিরুজ্জামান ও আকাশ হোসেন, মিজানুর রহমান (আবরারের রুমমেট), ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা এবং হোসেন মোহাম্মদ তোহা।

আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলনে উত্তাল রয়েছে বুয়েট ক্যাম্পাস। শেষ খবর, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। প্রয়োজনে ভর্তি পরীক্ষা পেছানোর দাবি শিক্ষার্থীদের।

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • *
  • এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আরও খবর

    kidarkar
    kidarkar