চাঁদাবাজি করেই কোটিপতি যুবলীগ নেতা বাবু

বাংলাদেশ

jahid hasan | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩২ অপরাহ্ন

দেশব্যাপী চলছে শুদ্ধি অভিযান। যার প্রভাবে এরই মধ্যে রাজধানীর পাড়া মহল্লা থেকে ক্ষমতাশীন রাজনৈতিক দলের ব্যানার ফেস্টুন সরানো শুরু হয়ে গেছে। অনেকেই দিচ্ছে না নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ও। বেশিরভাগ যুবলীগ নেতার অফিসেই ঝুলছে তালা। কোন কোন কাউন্সিলরও গাঁ ঢাকা দিয়েছে বলে জানা যায়। ক্যাসিনো দিয়ে শুরু হওয়া এই শুদ্ধি অভিযানের শেষ কোথায় সেটা সময় বলে দেবে। তবে অভিযানের পর থেকেই বেরিয়ে আসছে যুবলীগ নেতাদের টাকার পাহাড় বানানোর ফিরিস্তি। এমন একজন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী সারোয়ার বাবু। সংবাদ কালের কণ্ঠের।

অভিযোগ আছে, যুবলীগের এই নেতা নীরব চাঁদাবাজি করে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। টাকার দাপটে তিনি এখন পুরান ঢাকার গ্রেটওয়াল মার্কেটের সভাপতি। পদ আর দলের শক্তি দিয়ে এরই মধ্যে মার্কেটটির ৪০টি দোকান নিজের কব্জায় নিয়েছেন। অনেকের অভিযোগেও কোনো কাজ হয়নি। কারণ তার মাথার ওপর রয়েছে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট। বাবুর বিরুদ্ধে হাসপাতালের ক্রয় কমিটির সদস্য হয়ে টাকা লুট, যায়গা দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরান ঢাকার বাংলাবাজার পার হয়ে লঞ্চ ঘাটের দিকে যেতে হাতের বাম পাশে গ্রেটওয়াল মার্কেট। মার্কেটটিতে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয় পেতেই বেশ কিছু দোকানি আড়ালে গিয়ে কথা বলতে চাইলো। সবার সামনে কথা বললে নাকি বিপদ হতে পারে। এক দোকানি জানান, মার্কেটের প্রায় ৪০ টি দোকান দখল করে নিজের মতো করে দোকান বানিয়ে চালাচ্ছে যুবলীগের এই নেতা। তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারে না। বললেই হুমকি ধমকি দিয়ে দমিয়ে রাখা হয়।

দেখা যায়, গ্রেটওয়াল মার্কেটের গ্রাউন্ড ফ্লোরে তার বিশাল এক গার্মেন্টস আইটেমের দোকান। এই বড় দোকানের যায়গায় আগে দুটি দোকান ছিলো। আর প্রথম তলায় গিয়ে ২৭ নম্বর দোকানটিও তার দখলে। জানা যায়, মার্কেটের ৬ষ্ঠ তলায় এক নারীর দোকান দখল করে মার্কেটের সমিতি অফিস করার নামে নিজের অফিস চালাচ্ছেন এই নেতা। আর আন্ডারগ্রাউন্ডে দুজন দোকানির দোকান ভেঙ্গে করা হয়েছে একটি। দেখা যায়, চতুর্থ তলায় প্রায় ২০টি দোকান বাবুর। কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বললে তারাই স্বীকার করেন এখানে আগে ১৫টির বেশি দোকান ছিলো। বাবু মূল মালিকদের সরিয়ে দিয়ে নিজের মন মতো করে তিনটি বড় দোকান করেছে।

মার্কেট ব্যবসায়ী সূত্র বলছে যুবলীগের এই নেতা মার্কেটের সভাপতিত্বের নামে নিজেকে এর মালিক মনে করছে। যখন যা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে বিদ্যুৎসহ কোন সার্ভিসিং খরচই দেয়নি। কিছু বললে যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ভয় দেখান। রমজান মাসে তাকে বাধ্যতামূলক চাঁদা দিতে হয়। জাতীয় যে কোন দিবস উপলক্ষে বিপুল টাকা তোলা হলেও তার কোন হিসাব সমিতির অন্য সদস্য জানতে চাইতে পারে না। সরেজমিনে দখলকৃত দোকানের মালিকরা পর্যন্ত ভয়ে তাদের নাম প্রকাশ করতে চায়নি।

চতুর্থ তলার এক দোকানের মালিক জানায়, এই মার্কেটে (গ্রেটওয়াল) আমার দুটো দোকান ছিলো। ২০১৫ সালেও আমার দোকানটি ঠিকঠাক চলছিলো। এরপর থেকে হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন চাঁদা চাওয়ার বিষয়ে প্রতিবাদ করলে হুমকি ধমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে গত বছর আমার দোকানটি কবজা করে। সমিতির সভাপতি হওয়াতে অন্য কোন সদস্যও তেমন প্রতিবাদ করেনি। এখন বাকী দোকানটা নিয়েও ভয়ে আছি।

নাক প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক ব্যবসায়ী জানান, মার্কেটের জমিদাররা পর্যন্ত বাবুর কাছে জিম্মি। কারণ কোন কিছু হলেই তিনি সম্রাট ভাইকে দেখাইয়া দেয়। ভাইয়ের অফিসে ঢাকাইয়া নিয়া যায়। এরপর সম্রাট ভাই যা বলে তাই মাইনা নিতে হয়। কত রকম যে টাকা আত্মসাৎ করতাছে তার কোন হিসেব নাই। মার্কেটের এসি লাগানো নিয়া অনেক টাকা মারছে। কতটা আনছে কত কোটি টাকার এসি আনছে তার হিসেব নাই। কিন্তু আমাগো কাছ থেইক্কা দুই আড়াই লাখ টাকা নিয়া গেছে। সে মার্কেটে রাজত্ব করতাছে। অন্যজনের দোকান ভাইঙ্গা নিজের দোকানে ঢুকাইয়া নেয়। কেউ কিছু কইতে পারে না।

জানা যায়, বাবু ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল হাসপাতালের ক্রয় কমিটির অন্যতম সদস্য। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, হাসপাতালের টাকা বিভিন্ন কৌশলে মেরে দিচ্ছে। হাসপাতালের জন্য কেনা, মুরগির ডিম, বিস্কিট, পাউরুটি, কলা, গুড়া দুধ, ইত্যাদি পণ্য এবং মেডিক্যাল বিভিন্ন আইটেমের দাম দ্বিগুন ভাউচার করে টাকা হাতিয়ে নেন। এ বিষয়ে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার মাকসুদুল আলম বলেন, আসলে ক্রয় কমিটির দু’একজন সদস্যের অনিয়মের কথা সবার জানা। সব জিনিসের দাম অর্ধেকেরও বেশি বাড়িয়ে বিল করে গত কয়েক বছর লুটপাট করছে। যার কারণে হাসপাতালের নতুন পরিচালক টেন্ডার দেওয়ার পদ্ধতি বন্ধ রেখেছে।

জানা যায়, তার নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত, ওয়াসা, রাজউকসহ বিভিন্ন ভবনের ঠিকাদারিও। অভিযোগ আছে পুরান ঢাকার সুমনা হাসপাতালের একটি যায়গা দখল করে বাবু রিকশা গ্যারেজ করে ভাড়া দিয়ে রেখেছে। যেখান থেকে প্রতিদিন সাড় ৪ হাজার টাকা নিয়ে যায় তার লোক। গত সোমবার দুপুরে সূত্রাপুর পেরিদাস রোড ৩৩/১ এর পাশের সুমনা মেডিক্যালের যায়গায় গড়ে তোলা রিক্শা গ্যারেজ গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বাবুর লোকের টাকা নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ বিষয়ে কথা বললে হাসপাতালের মালিক পক্ষের একজন বলেন, যায়গাটি হাসপাতালের এটা সবার জানা। কিন্তু ক্ষমতা খাটিয়ে সেখানে রিকশা গ্যারেজ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গত সোমবার গ্রেটওয়ালের সভাপতি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী সরোয়ার বাবুর অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার অফিসে তালা লাগানো পাওয়া যায়। পরে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে। সূত্র : কালের কণ্ঠ

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • *
  • এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আরও খবর

    kidarkar
    kidarkar