আফিফ-মিরাজরা পায় গাড়ি-বাড়ি, আর আমরা পাই ফুল: রোমান

এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টে (স্টেজ-৩) স্বর্ণ পদক জিতে সোমবার দেশে ফিরেছেন দেশসেরা আরচার রোমান সানা। ব্যক্তিগত ইভেন্টে স্বর্ণের পাশাপাশি দলগত ও মিশ্র দলগততেও পদক জেতেন এই তারকা। এর আগে জুনে নেদারল্যান্ডসে ওয়ার্ল্ড আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে রুপা জেতেন তিনি। যেটি আরচারির বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম সাফল্য। সেই আসরেই দেশের প্রথম আরচার হিসেবে ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে খেলা নিশ্চিত হয় রোমানের।

ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরে সাফল্য পাওয়ায় রোমানকে নিয়ে বাড়ছে স্বপ্নের পরিধি। রোমান চোখ রাখছেন অলিম্পিক পদকে। তবে একটা জায়গায় মনে খুব অভিমান খুলনার তালতলার এই তরুণের। এত এত সাফল্যের পরও কখনো তেমন কোনো সংবর্ধনা মেলেনি তার। ফেডারেশন বা ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মিষ্টিমুখেই থেকেছে সীমাবদ্ধ।

গেল শুক্রবার ফিলিপাইনের ক্লার্ক সিটিতে এশিয়া কাপ আরচারির স্বর্ণ নিশ্চিত করেন রোমান। একই দিন ক্রিকেটে ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে আফিফ হোসেন ধ্রুব ফিফটি করে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ জেতান। কিন্তু রোমানের অভিযোগ, আফিফকে নিয়ে যে মাতামাতি হয়েছে, তাকে নিয়ে তার কিছুই হয়নি। সোমবার সন্ধ্যায় একটি নিউজ পোর্টালের সঙ্গে একান্ত আলাপে অভিমানী এমন রোমানকেই পাওয়া গেল।

রোমান বললেন, ‘কেন আক্ষেপ থাকবে না বলুন? এই অর্জনগুলো কিন্তু ক্রিকেটের থেকেও অনেক বড়। ক্রিকেট কিন্তু কখনোই এশিয়া কাপ জিততে পারেনি। সেখানে আমি ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে অলিম্পিক কোয়ালিফাই করে পদক (রুপা) জিতেছি। এশিয়া কাপে নম্বর ওয়ান হয়েছি। এটা কি ক্রিকেটের চেয়ে বড় অর্জন নয়? আপনারাই এটা বিবেচনা করে দেখতে পারেন।’

রোমান উদাহরণ টানেন, ‘ক্রিকেট কয়টা দেশ খেলে বলেন? মাত্র ৬টা দেশ এশিয়া কাপ খেলে। আমি এশিয়া কাপ খেলেছি, ১৫টা দেশ ছিল। এর আগে ২০১৪ সালে যেটা হয়েছে (এশিয়ান আর্চারি গ্র্যান্ড প্রিক্স) সেখানে ২২টা দেশ ছিল। সেখানেও গোল্ড পেয়েছিলাম। তারপরও আমি ফুল আর মিষ্টি ছাড়া কিছুই পাইনি।’

ক’দিন আগে ওয়ার্ল্ড আরচারিতে পদক ও অলিম্পিক কোয়ালিফাই করার পরও এতটা অভিমানী ছিলেন না রোমান। সব নিজের মনের ভেতরই রেখেছেন। কিন্তু এবার এশিয়া কাপে সাফল্যের পর সব কষ্টের কথা প্রকাশ্যে বলছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও পোস্ট করেছেন এ নিয়ে। আপাত শান্ত-শিষ্ট রোমান হঠাৎ কেন এভাবে সরব হলেন?

রোমান জানান তাকে কষ্ট দিয়েছে আসলে এই ঘটনা- ‘আমি যখন গোল্ড মেডেলটা পেলাম, তখন আমি ফেইসবুকে একটা পোস্ট দেখলাম, আফিফ হোসেনকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিলেন…। তখন চিন্তা করলাম, হায়রে জিম্বাবুয়ে…। তাদের সাথে একটা ফিফটি করেছে, তাই প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা। এদিক থেকে ওদিক থেকে কত কি! আর আমি ১৫টা দেশের এতগুলো আরচারের ভেতরে স্বর্ণ জিতে আনলাম, আর আমার বেলায় কোনো কিছু নেই।’

এখানেই থামেননি রোমান, ‘ত্রিদেশীয় সিরিজে একটা ম্যাচ জেতার পর আরেকটা হেরে গেছে বাংলাদেশ। আমার এমন হলে তো দেশে এসে বেডিং গুছিয়ে বাড়ি যেতে হতো। একটা খেলায় হারলে আমাদের কোনো সুযোগ থাকে না। তাহলে বুঝুন আমাদের খেলাটা কত কঠিন।’

নিজ শহরেরই ক্রিকেট তারকা মেহেদী হাসান মিরাজের প্রসঙ্গ টেনে রোমান বলেন, ‘মেহেদী মিরাজের কথা বলি। প্রথম ও যখন টেস্টে খেলল, রেকর্ড করল। একটা সিরিজ খেলেই বাড়ি, গাড়ি, জায়গা-জমি সবই পেল। আমি রোমান সানা, প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অলিম্পিক কোয়ালিফাই করলাম, এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হলাম দুইবার। আন্তর্জাতিক আসরে আমার ৪টা ব্যক্তিগত স্বর্ণ, টিমে ৮টা স্বর্ণ, সিলভার মেডেল আছে। আর কত লাগবে বলেন। আমার ধারেকাছে মনে হয় না বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড় আছে।’

অভিমানী রোমান আন্তর্জাতিক সাফল্যে ক্রিকেটের চেয়েও আরচারিকে এগিয়ে রাখেন। এমনকি তার মতে আরচারিই এখন দেশের সেরা খেলা।

কেন এমন মনে করেন তার ব্যাখ্যায় রোমান বলেন, ‘দেখেন, আমি এখন আরচারি খেলোয়াড় বলে ক্রিকেটকে ছোট করে দেখছি ব্যাপারটা তা নয়। আমি নিজেও একসময় ক্রিকেট খেলেছি। একসময় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ছিল আমার। আপনারাও বিষয়টি চিন্তা করে দেখেন। ক্রিকেটে কিন্তু একবারো এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। আমরা এখন যে আসর খেলে এলাম এটাও এশিয়া কাপ। আমি কিন্তু দুই বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি এশিয়া কাপে, আর দুইবার রানার্সআপ। তাহলে আমার প্রাধান্যটা বড় না?

রোমান বলে যান, ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অলিম্পিক কোয়ালিফাই করেছি। সিদ্দিকুর রহমান এর আগে খেলেছেন সরাসরি। তবে সেটা র‌্যাঙ্কিংয়ের কারণে। নির্দিষ্ট গেম খেলে কিন্তু কোটা প্লেস নিশ্চিত করেনি। আমি সেখান থেকে পদক নিয়ে আসছি। ৯২টি দেশ, ৫৫ টি দল ছিল। সেখানে ২০৯ জন আরচারকে টপকে ছয়টা ম্যাচ জিতে পদক নিয়ে এসেছি। আর ক্রিকেট কয়টা দেশ খেলে বিশ্বের ভেতরে। আমাদের আর্চারি খেলে না হলেও দেড় শ টার ওপরে দেশ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি বলি আরচারি বড় খেলা।’

আফসোসের সুরে রোমান আরো বলেন, ‘ক্রিকেট অনেক বড় খেলা। আমি চাইলেও ক্রিকেটকে ছোট করতে পারব না। আমাদের প্রচারণা নেই। লাইভ দেখানো হয় না টিভিতে। কিন্তু বাইরের দেশে যান। আমি যখন জার্মানিতে খেলেতে গেছি, আমার অটোগ্রাফ নিতে বুড়ো থেকে ছোট, সবাই চলে আসছে। সুইজারল্যান্ডে ট্রেনিংয়ে ছিলাম সেখানেও তাই। কিন্তু আমার দেশে আমার কোনো মূল্য নেই। এটা হলো আফসোস।’

সূত্র-দেশ রূপান্তর