স্বপ্নের ফ্রান্সে যাওয়ার পথে স্লোভাকিয়ার জঙ্গলে প্রাণ গেল ব্যাংক কর্মকর্তা ফরিদের

প্রবাস

rana miya | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:০৭ অপরাহ্ন

ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে অবৈধ পথে দালালের মাধ্যমে ফ্রান্স যেতে চেয়েছিলেন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার কারিকোনা গ্রামের সমশাদ আলীর ছেলে ফরিদ উদ্দিন (৩৫)। রাশিয়া-ইউক্রেন ঘুরে ফ্রান্স যাওয়ার পথে স্লোভাকিয়ার জঙ্গলে তার মৃত্যু হয়েছে।

দেশটির পুলিশ জঙ্গল থেকে লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে রাখে। গত বৃহস্পতিবার লন্ডন থেকে ফরিদের ভাই আলকাছ আলী স্লোভাকিয়ায় গিয়ে ফরিদের লাশ শনাক্ত করেছেন। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন ফরিদের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ফুপাতো ভাই আবু বক্কর।

এদিকে ফরিদের মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত হওয়ার পর তার বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। ফরিদের স্ত্রী সেলিনা সুলতানা, ৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইরা তাসফিয়াকে জড়িয়ে ধরে আহাজারি করছেন আত্মীয়-স্বজনরা।

ফরিদ উদ্দিনের ভাই আলা উদ্দিন জানান, ফরিদ একটি বেসরকারি ব্যাংকের বিশ্বনাথ শাখায় কর্মরত ছিলেন। তার স্ত্রী সেলিনা সুলতানা একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। স্বামী-স্ত্রীর চাকরিতে তাদের সংসার ভালো চলছিল। কিন্তু ফরিদ উদ্দিন ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। ২০১৮ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে রাশিয়া যান ফরিদ উদ্দিন। খেলা শেষ হওয়ার মাস খানেক পর তিনি রাশিয়া থেকে ইউক্রেন যান এবং সেখানে কয়েক মাস অবস্থান করেন। সম্প্রতি ইউক্রেন থেকে ফ্রান্স যাওয়ার জন্য রাশিয়ায় অবস্থানরত দাদা নামে পরিচিত দালাল চট্টগ্রামের লিটন বড়ুয়ার সঙ্গে চুক্তি করেন ফরিদ।

চুক্তি অনুযায়ী দালাল লিটন বড়ুয়ার বাংলাদেশে অবস্থানরত এজেন্ট সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার কামাল নামের একজনের কাছে ৭ লাখ টাকা জমা রাখেন ফরিদের পরিবার। কথা ছিল মাত্র ২ ঘণ্টা পায়ে হেঁটে এবং বাকি রাস্তা বৈধভাবে গাড়িতে করে ফরিদকে ফ্রান্স পৌঁছানো হবে। চুক্তির পর ইউক্রেনে দালালের শিবিরে গিয়ে প্রায় ১ মাস অবস্থান করেন ফরিদ। গত ২৭ আগস্ট পরিবারের সঙ্গে সর্বশেষ মোবাইল ফোনে কথা বলেন ফরিদ। এ সময় তিনি জানান, পরদিন (২৮ আগস্ট) ফ্রান্সের উদ্দেশে অন্যদের সঙ্গে যাত্রা করবেন তিনি। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ হয়নি ফরিদের।

গত ২ সেপ্টেম্বর ফরিদের ফ্রান্স যাত্রাপথের এক সঙ্গী ফোন করে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত ফরিদের ভাই আলকাছ আলীকে জানান, ২৮ আগস্ট একজন দালালের সঙ্গে ফরিদ উদ্দিনসহ তারা ৬ জন ইউক্রেন থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। পায়ে হেঁটে ফ্রান্স পৌঁছতে তাদের ৫ দিন সময় লাগে। কিন্তু তাদের সঙ্গে খাবার ছিল মাত্র দুই দিনের। তাই সঙ্গে থাকা খাবার শেষ হয়ে গেলে তাদেরকে বন্য প্রাণীর (শূকরের) মাংস খেতে দেয় দালাল। কিন্তু এই খাবার খাননি ফরিদ। তিনি সঙ্গে থাকা খেজুর খেয়ে আরও একদিন কাটান। দুই দিন পায়ে হেঁটে তারা পৌঁছান স্লোভাকিয়ার একটি জঙ্গলে। সেখানে পৌঁছার পর সঙ্গে থাকা খেজুরও শেষ হয়ে গেলে শূকরের মাংস খেতে বাধ্য হন ফরিদ। এটা খাওয়ার পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন ফরিদ। তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে এবং ডায়রিয়া শুরু হয়। ওই জঙ্গলে সেদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ঘুম থেকে উঠে তারা আর ফরিদকে পাননি। অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে বাধ্য হয়ে তারা ফরিদকে রেখেই ফ্রান্সের উদ্দেশে রওনা দেন এবং ২ সেপ্টেম্বর তারা ফ্রান্সে পৌঁছান। এই খবর পাওয়ার পর থেকে ফরিদের বাড়িতে আহাজারি চলছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ফরিদের ভাই আলকাছ আলী যুক্তরাজ্য থেকে তার আরও দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে স্লোভাকিয়ায় গিয়ে ফরিদের লাশ শনাক্ত করেছেন।

ফরিদ উদ্দিনের ফুপাতো ভাই, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আবু বক্কর জানিয়েছেন, ৯ সেপ্টেম্বর স্লোভাকিয়ার ‘জওজে টিভি’র বরাত দিয়ে সেদেশের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল একটি সংবাদ প্রচার করে। ওই সংবাদে উল্লেখ করা হয় ‘স্লোভাকিয়ার স্টারিনা জঙ্গলে একজন পর্যটক আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির লাশ দেখতে পান। তিনি বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেন। এরপর পুলিশ লাশটি উদ্ধার করেছে।’ এই সংবাদটি ফরিদের যুক্তরাজ্যের স্বজনরা দেখতে পান। এরপর তারা স্লোভাকিয়ার পুলিশের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ইমেইলে ফরিদের বিভিন্ন তথ্য প্রদান করেন। এর ভিত্তিতে উদ্ধারকৃত লাশটি ফরিদের বলেই প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয় স্লোভাকিয়ার পুলিশ। এরপর তারা ফরিদের স্বজনদের সেদেশে গিয়ে লাশ শনাক্ত করতে বলে। গত বৃহস্পতিবার ফরিদের ভাই আলকাছ আলী, তার বন্ধু যুক্তরাজ্য পুলিশে কর্মরত মুন্নী ও তার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে স্লোভাকিয়ায় গিয়ে ফরিদের লাশ শনাক্ত করেছেন।

ফরিদের ভাই আলা উদ্দিন জানান, লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি তার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য দালালচক্রকে দায়ী করে এর বিচার দাবি করেছেন।

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • *
  • এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আরও খবর

    kidarkar
    kidarkar