বৃদ্ধাকে পি’টিয়ে র’ক্তা’ক্ত করলেন ওসি-কনস্টেবল (ভিডিও)

বরিশালের উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি শিশির কুমার পালের বি’রুদ্ধে এক সাবেক পু’লিশ কর্মকর্তার বিধবা স্ত্রীকে থানার মধ্যে প্রকাশ্যে মা’রধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে ওই বৃদ্ধার গালে র’ক্তাক্ত জ’খম এবং শরীরের বিভিন্নস্থানে জ’খমের সৃষ্টি হয়েছে।

একই সাথে রাশিদা বেগম (৬২) নামের ওই বিধবাকে মা’রধরের পর তার গালে সিগারেটের আগুনের ছ্যাকা দিয়েছেন কনস্টেবল পু’লিশ সদস্য জাহিদ। এ ঘটনার পরপরই নির্যাতনের শিকার ওই বৃদ্ধাকে থানা সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানের সামনে চিৎকার করে কান্না করতে দেখা যায়।

খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক স্থানীয় সংবাদকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হলে ওসির হাতে মা’রধরের শিকার বৃদ্ধা রাশিদা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘জাহিদ পু’লিশ এই চায়ের দোকানে (থানা সংলগ্ন পশ্চিম পার্শ্বে বাচ্চুর দোকান) বসে আমার গালে সিগারেটের আগুনের ছ্যাকা দিয়ে পুড়িয়েছে। দেয়ালের সাথে আমার মাথা ঠুকিয়েছে। পিঠে ও ঘাঁড়ে ছয় থেকে সাতটি ঘুষি দিয়েছে। পাশের লোকজন ও দোকানদার না থাকলে আমাকে মেরেই ফেলতো। মা’রধরের সাথে আমার মা-বোন নিয়েও গালিগালাজ করেছে।’

এ সময় রাশিদা কাঁদতে থাকে আরো বলে ‘মার খেয়ে ওসির কাছে গেলাম ওসি আবারও মারলো। পু’লিশের হাতে মা’রধরের শিকার হয়ে আমি সাথে সাথে ওসি শিশির কুমার পালকে বিষয়টি জানাই। এ সময় সেখানে উপস্থিত থানার আরও একজন পু’লিশ কর্মকর্তা ওসিকে ঘটনার সাক্ষি দেন।

এ কথা শোনার পরই ওসি শিশির চেয়ার থেকে উঠে আমাকে গালি দিয়েই বলে, ‘শালির ঝি শালি বের হ, এখানে আসছো কেনো।’ এরপর শুরু করে দুই গালে থাপ্পড়। এক পর্যায়ে ওসি থাপ্পড় দিতে দিতে তার রুম থেকে বের করে দেয়। তারপরও আবার বাইরে এসে আমাকে গলা ধাক্কাতে ধাক্কাতে থানার পশ্চিম পাশ্বের ব্রিজের গোড়ায় মাটিতে ফেলে দিয়েছে। এতে হাত-পায়ের অনেক স্থানের চামড়া উঠে গেছে।

কেনো এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে জানতে চাইলে বৃদ্ধা রাশিদা এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলার পানিচত্বর এলাকার বাসিন্দা। তার স্বামী মঈন উদ্দিন মাতবর একজন পু’লিশ কর্মকর্তা ছিলেন। দীর্ঘদিন ১৬ বছর পূর্বে তার স্বামী দায়িত্ব পালনকালে মারা যায়। গত দেড় বছর আগে রাশিদার বড় ছেলে রাসেলের বৌ খুন করে তার ছেলে রাসেল ও হাসানকে।

বৃদ্ধা রাশিদার ছোট ছেলে পরিবহন শ্রমিক বাবু (২১) জানায়, দুই সহোদর ভাই ভাবীর হাতে খুন হওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তার বৃদ্ধা মা রাশিদা বরিশাল পু’লিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অফিসে দৌড়ঝাপ করতেছিলো। প্রায় প্রতিদিন যাতায়াত করতে হতো পিবিআই অফিসে। এজন্য তার মা বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ইচলাদী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন কালাম নামের এক ব্যক্তির বাসায় ভাড়া থাকতেন। সেখানে মায়ের কাছে প্রায়ই তার সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া ছোট বোন (১১) বেড়াতে যেতো।

নির্যাতিতা রাশিদা জানান, প্রায় এক মাস আগে মেয়ে তার কাছে বেড়াতে আসলে মেয়েকে ওই ভাড়া বাসায় রেখে তিনি (রাশিদা) মামলার কাজে বরিশাল শহরে যান। এই সুযোগে বাসা থেকে স্থানীয় শুক্কুর, বোরহান, আনিচ, কালামসহ বেশ কয়েকজন বখাটে মিলে তার মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে উজিরপুর মডেল থানায় অভিযোগ করলে পু’লিশ গত ২৪ দিন আগে তার মেয়েকে উদ্ধার করে। পরবর্তীতে পু’লিশ সংবাদ দিয়ে তাকে থানায় ডেকে মেয়েকে তার হাতে বুঝিয়ে দেন।

এ সময় বৃদ্ধা রাশিদা থানার ওসি শিশির কুমার পালকে বলেন, ‘দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। কিন্তু ওসি তাকে বলে আপনার মেয়ে পেয়েছেন আপনি চলে যান বিচার হয়ে গেছে।’

এ অবস্থায় থানা থেকে মেয়েকে নিয়ে বৃদ্ধা রাশিদা বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। পথে পূর্বের অভিযুক্তরাই আবার তার মেয়েকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তখন আবারও থানায় এলে ওসির কথানুযায়ী অভিযোগ লিখে জমা দেন। কিন্তু তাতেও কোনো সুফল না পেয়ে পরদিন নতুন করে আবার একটি অভিযোগ দিলে ওসি রাশিদার সামনে অভিযোগ ছিঁড়ে ফেলে দেন।

বৃদ্ধা রাশিদা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, এভাবে ৩ বার ওসির কাছে অভিযোগ দিয়েছি আর প্রত্যেকটি অভিযোগ ওসি তার সামনেই ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে, ‘এসব নিয়ে সময় নষ্ট করা সম্ভব না।’

এদিকে মেয়েকে ছিনিয়ে নেয়া বখাটেদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেয়ায় তার স্বজনরা রাশিদার ভাড়া বাসায় তালা ঝুঁলিয়ে দেয়। পরে উপায়ান্তর না পেয়ে ২-৩ দিন আগে বৃদ্ধা রাশিদা বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির সাথে সাক্ষাত করে তাকে পুরো ঘটনা জানিয়ে ওসি শিশিরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষনিক রেঞ্জ ডিআইজি উজিরপুর থানার ওসি শিশিরকে ফোন করে বৃদ্ধা রাশিদাকে আইনি সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি তার ভাড়া বাসা থেকে মালামাল উদ্ধারের কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।

রাশিদা আরও বলেন, ডিআইজি স্যারের কাছে যাওয়ার পরে ওসি বুধবার (১১ সেপ্টম্বর) সন্ধ্যায় আমাকে থানায় ডেকে আনেন। সন্ধ্যায় আমি থানায় ওসির সাথে দেখা করতে রুমে গেলে তিনি বলেন, আপনি একটু পরে আসেন, আপাতত থানার বাইরে চায়ের দোকানে গিয়ে বসেন।’

ওসির কথানুযায়ী রাশিদা তার রুম থেকে বেরোতেই পু’লিশ সদস্য জাহিদ তাকে বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলে জানায় মাদারীপুর। এরপর একটু সামনে এগিয়ে থানার পশ্চিম পাশের গেটের কাছে আসলে বৃদ্ধা রাশিদাকে জাহিদ পুনরায় বাড়ির কতা জিজ্ঞেস করেন। তিনি একই উত্তর দেন। পরবর্তীতে থানার সামনের বাচ্চুর চায়ের দোকানে গিয়ে বসলে ওই পু’লিশ সদস্য জাহিদ ফের রাশিদাকে বলে আপনার বাড়ি কোথায়, এখানে কি?

এ সময় বৃদ্ধা রাশিদা রেগে গিয়ে জাহিদকে জানায় ‘কয়েকবার তো বললাম মাদারীপুর, শোনেনি।’ এরপরই পু’লিশ সদস্য জাহিদ তাকে মা’রধর করে এবং এক পর্যায়ে গালে সিগারেটের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

নির্যাতিতা রাশিদা ও তার ছেলে বাবুর দাবী, রেঞ্চ ডিআইজির কাছে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় থানার ওসি শিশির কুমার পাল রাশিদার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তাই বিষয়টি প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সঠিকভাবে তদন্ত করে অভিযুক্ত ওসি শিশির কুমার পাল ও পু’লিশ সদস্য জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানিয়েছে ভুক্তভোগী ও তার স্বজনরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত পু’লিশ সদস্য মো: জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি বাচ্চুর দোকানে চা খেতে গিয়ে দেখি ওই মহিলা ওসি স্যার’কে নিয়ে গালাগালি করতেছে। তখন ওই মহিলাকে বাধা দিলে সে আমাকেও গালিগালাজ করে। এ সময় আমি তাকে সেখান থেকে তাড়ানোর জন্য মা’রধরের ভয় দেখিয়েছিলাম।’

অভিযুক্ত উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিশির কুমার পালের ০১৭১৩৩৭৪২৭৬ নাম্বারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাচ্ছেন না জানিয়ে ফোনটি কেটে দেন।

বরিশাল জেলা পু’লিশ সুপার মো: সাইফুল ইসলাম বিপিএম জানান, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ সূত্রঃ আমার-সংবাদ

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন