কাফনের কাপড়ও জোটেনি কর্নেল জামিলের

শহীদ কর্নেল জামিল আহমেদ মিঠু। এক হতভাগা কর্তব্যপরায়ণ সেনা কর্মকর্তা। যিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। অথচ এই বীরের ভাগ্যে জোটেনি এক টুকরো কাফনের কাপড় কিংবা দাফনের আগে জানাজাও। সেনা প্রহরায় রক্তাক্ত বিছানার চাদর মুড়িয়ে সমাহিত করা হয় তাঁকে। প্রতিকূল সময় পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও কর্নেল জামিলের নামে সেনানিবাস বা এর বাইরে কোনো স্থাপনার নামকরণ হয়নি। এমনকি রাজধানীর সোবহানবাগে যে স্থানে জামিলকে গুলি করে হত্যা করা হয় সেখানেও নির্মাণ হয়নি কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। গত ৮ আগস্ট কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপচারিতায় দুঃখ করে এসব তথ্য জানান কর্নেল জামিলের কন্যা আফরোজা জামিল কঙ্কা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমণ্ডিতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় হামলা চালায় বিপথগামী সেনা সদস্যরা। এই হামলার খবরে যখন সেনাপ্রধানসহ প্রভাবশালী অনেক কর্মকর্তাই খেই হারিয়ে ফেলেন, তখন নিজের কর্তব্যের ডাকে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে যান রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্নেল জামিল আহমেদ। কিন্তু ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসায় পৌঁছানোর আগেই সোবহানবাগ মসজিদের কাছে গুলি করে হত্যা করা হয় কর্নেল জামিলকে।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণা করে কর্নেল জামিলের দ্বিতীয় কন্যা আফরোজা জামিল কঙ্কা কালের কণ্ঠকে বলেন, “বাবা রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব হিসেবে গণভবন কম্পাউন্ডেই বাসভবন পেয়েছিলেন। সেই বাসার মা-বাবার শয়নকক্ষের পাশেই ছিল আমাদের কক্ষ। ১৫ আগস্ট ভোরের দিকে বাবা ও মায়ের উচ্চৈঃস্বরের কথাবার্তায় আমার এবং বড় বোনের ঘুম ভেঙে যায়। আমার বয়স তখন ১২ আর বোনের বয়স ১৫। আমরা এগিয়ে গিয়ে দেখলাম মা-বাবা উদ্বিগ্ন। বাবা বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছেন। শুনলাম বঙ্গবন্ধু ফোন করেছিলেন। বাসার লাল ফোনটা বেজে উঠতেই মা (আনজুমান আরা) এগিয়ে গিয়ে ফোনটা ধরেছিলেন। ওপাশ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘জামিল কই? জামিলকে দে।’ মা দ্রুত বাবাকে ডেকে দেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ শেষে বাবা জানান, ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসায় হামলা হয়েছে। বাবা সেনাপ্রধানসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন। সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহ ধানমণ্ডিতে ফোর্স পাঠাবেন বলে বাবাকে আশ্বস্ত করেন।”

আফরোজা জামিল কঙ্কা বলেন, “সময় নষ্ট না করে বাবা ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসার দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর গাড়ির চালক আইনউদ্দিন মোল্লাকে ডেকে গণভবনে অবস্থানরত পিজিআর সদস্যদের ৩২ নম্বরের দিকে এগোনোর খবর দিতে বলেন। আমার বড় বোন বাবাকে এক গ্লাস পানি এনে দিলেন। বাবা প্রচুর সিগারেট খেতেন। তিনি পানি খেয়ে সিগারেট ধরালেন। সিগারেটটা একটু খেয়েই ফেলে দিলেন। এরপর বাবা সিভিল ড্রেসেই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দিকে রওনা হন। মা একটু ইতস্তত করছিলেন। বাবা বললেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বিপদ, আমাকে যেতেই হবে।’ তখন মা বললেন, ‘ফেরার সময় শ্বেতাকে (কর্নেল জামিলের তৃতীয় কন্যা ফাহমিদা আহমেদ শ্বেতা সেদিন মোহাম্মদপুরে খালার বাসায় অবস্থান করছিলেন) নিয়ে এসো।’ বাবার সঙ্গে এটাই ছিল মার শেষ কথা।”

আফরোজা জামিল বলেন, “বাবা চলে যাওয়ার পরই অজানা আশঙ্কায় মা বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন। আমাদের চাচাকে ফোন করলে চাচা বলেন, ‘তুমি মিঠুকে (জামিলের ডাকনাম) আটকালে না কেন?’ মা তখন আরো উদ্বিগ্ন হয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ফোন করতে থাকেন। সকাল ৯টার দিকে বাবার গাড়িচালক আইনউদ্দিন বাসায় ফিরে এলো। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার সাহেবকে কোথায় রেখে এসেছ?’ আইনউদ্দিন কিছু না বলে শুধু কাঁদতে থাকল। জোহরের নামাজের সময় সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ ফোনে মাকে বললেন, ‘ভাবি, জামিল ভাই আর নেই।’ এর কিছুক্ষণ পরে দুজন সেনা কর্মকর্তা আমাদের বাসায় এসে আমাদের লালমাটিয়ায় বড় চাচার বাসায় নিয়ে গেল।”

কর্নেল জামিলের গাড়িচালক আইনউদ্দিন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ২০ নম্বর সাক্ষী। আইনউদ্দিনের উদ্ধৃতি দিয়ে আফরোজা জামিল বলেন, ‘১৫ আগস্ট সকালে গণভবনে পিজিআরের ফোর্সকে হাতিয়ার-গুলিসহ পাঁচ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে কর্নেল জামিল তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িতে রওনা হন। ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর রোডের মাথায় তাঁরা গণভবন থেকে আসা ফোর্সদের দেখেন। সোবহানবাগ মসজিদের কাছে পৌঁছলে দক্ষিণ দিক থেকে অসংখ্য গুলি আসতে দেখেন। তখন আইনউদ্দিন ফোর্স অ্যাটাক করানোর কথা বললে কর্নেল জামিল বলেন, এটা ওয়ার ফিল্ড নয়, ফোর্স অ্যাটাক করালে সিভিলিয়ানদের ক্ষতি হতে পারে। আইনউদ্দিনকে প্রতিপক্ষের অবস্থান জেনে আসতে নির্দেশ দিয়ে কর্নেল জামিল গাড়িতেই বসে থাকেন। আইনউদ্দিন যখন দেয়াল ঘেঁষে ৩২ নম্বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পাঁচ-ছয়জন সেনা সদস্য দৌড়ে জামিলের গাড়ির দিকে যায়। আইনউদ্দিন হাতে ইশারা করে কর্নেল জামিলকে সরে যেতে। স্যার, স্যার বলে আওয়াজও করেন কয়েকবার। কিন্তু কর্নেল জামিল তাঁর দিকে তাকাননি। ওই সময় অস্ত্রধারী সেনারা জামিলের গাড়ির কাছে পৌঁছে যায়। তিনি দুই হাত উঠিয়ে তাদের কিছু বলার বা বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা দুই-তিনটি গুলি করলে কর্নেল জামিল মাটিতে পড়ে যান।’

কর্নেল জামিলকে হত্যার পরও নিষ্ঠুরতা থামেনি বিপথগামী সেনাদের। জামিলকে হত্যার পর তাঁর আপনজনদের কান্নার অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছিল সেনারা। উচ্চেঃস্বরে কাঁদা বা হৈচৈ করা যাবে না—এই শর্তে রাজি হয়ে শহীদ জামিলের মরদেহ দেখতে পান স্বজনরা। এ সময় পাহারায় থাকা সেনারা রাইফেল তাক করে রেখে কান্না চাপাতে বাধ্য করে স্বজনদের।

আফরোজা জামিল বলেন, ‘আমরা লালমাটিয়ায় চাচার বাসায় বাবার লাশের অপেক্ষায় ছিলাম। বাবার লাশটি তখন ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসার গ্যারেজে গাড়িতেই পড়ে ছিল। ঘাতকরা আমাদের লাশটিও দেখতে দিতে চায়নি। মা তখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর-উত্তমকে অনুরোধ করেন। খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল ফারুকের আত্মীয় ছিলেন। খালেদ মোশাররফের হস্তক্ষেপেই বাবার লাশটি আমাদের দেখতে দেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১১টায় একটি ল্যান্ড রোভার গাড়িতে বাবার লাশ লালমাটিয়ায় আমাদের আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে আসে। গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে রাখা বাবার পা দেখতে পাই। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেনা সদস্যরা সিদ্ধান্ত বদল করে। তারা বাবার লাশ দেখতে না দিয়ে সেনানিবাসে খালেদ মোশাররফের বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে রক্তাক্ত লাশটি গোসল করিয়ে বিছানার চাদর দিয়ে মোড়ানো হয়। আমার চাচি আমেরিকা থেকে একটি সাদা চাদরটি এনেছিলেন। খালেদ মোশাররফের স্ত্রী আজমির শরিফ থেকে কিছু আতর আর সুগন্ধি এনেছিলেন। এগুলো ছিটিয়ে দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘ওই বাসা থেকেই বাবার মুখটা আমাদের শেষবারের মতো দেখতে দিয়ে লাশটি বনানী কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। পদস্থ সেনা কর্মকর্তা হওয়ার পরও সেদিন কর্নেল জামিলের জানাজা পড়ানো হয়নি, হয়নি কাফনের কাপড়ের ব্যবস্থাও। রক্তাক্ত বিছানার চাদর মুড়িয়ে বাবাকে সমাহিত করা হয়।’

কর্নেল জামিলকে হারিয়ে অথৈ পাথারে পড়েন স্ত্রী আনজুমান আরা। যে চেনা মুখগুলো বিভিন্ন সময়ে নানা সুযোগ-সুবিধার জন্য জামিলের কাছে ধরনা দিয়েছে, তারাই যেন কেমন অচেনা হয়ে যায়। এসব বুঝে নিয়ে দৃঢ়চেতা আনজুমান আরা কারো অনুকম্পার আশায় না থেকে নিজেই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ বেছে নেন। জামিলকে হত্যা করার পর তাঁর চল্লিশার দিনে আনজুমান আরা টের পান তিনি আবারও সন্তানসম্ভাবনা। ফলে তার লড়াইটা আরো কঠিন হয়ে যায়। ১৯৭৬-এ জন্ম নেয় কর্নেল জামিলের চতুর্থ কন্যা কারিশমা জামিল। যে সন্তান কোনো দিন মুখ দেখতে পায়নি তার বাবার। আফরোজা জামিল বলেন, “চার মেয়েকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েন মা। এ সময়ে তিনি ভারত, সুইডেনসহ কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রস্তাব পান। কিন্তু যে মাটিতে কর্নেল জামিলকে সমাহিত করা হয়েছে তা ছেড়ে যেতে রাজি হননি তিনি। তিনি বলতেন, ‘আমরা দেশ ছেড়ে গেলে কর্নেল জামিলকে কেউ মনে রাখবে না।’’’

কর্নেল জামিলের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে আফরোজা জামিল বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘ সময় কর্নেল জামিলের আত্মদানকে মূল্যায়ন করা হয়নি। তবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে কর্নেল জামিলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে জামিলের পরিবারের উদ্যোগে গঠন হয় কর্নেল জামিল ফাউন্ডেশন। জামিলের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০০৯ সালে তাঁকে বীর-উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। পরে সেনাবাহিনী কর্নেল জামিলকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করে।’