রবিউলের এক গোলের ওপর দাঁড়িয়ে ফুটবল

গত জুনে লাওসের বিপক্ষে রবিউল হাসানের অ্যাওয়ে গোলটির কাছে বাংলাদেশ ফুটবলের ঋণের শেষ নেই। প্রাক-বিশ্বকাপ বাছাইয়ে খেলা ছিল লাওসের সঙ্গে, আশা-আকাঙ্ক্ষা আর উত্কণ্ঠার মোড়কে বাঁধা ম্যাচ দুটির গর্ভে লুকিয়ে ছিল ফুটবলের ভবিষ্যৎ। ‘হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে’ ম্যাচ দুটির হার্ডল জয়ে পার করা গেলে আলোকিত হবে ফুটবল, নইলে তলিয়ে যাবে আরো তিমিরে। লাওসের মাঠে গিয়ে অ্যাওয়ে ম্যাচ জেতে বাংলাদেশ রবিউলের গোলে। এরপর হোম ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হলেও তরুণ মিডফিল্ডারের ওই গোলে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে।
সনৎ বাবলা ১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে

রবিউলের এক গোলের ওপর দাঁড়িয়ে ফুটবল
অ- অ অ+

তাঁর একটি গোলের কত মহিমা! দেশের ফুটবলকে রাঙিয়েছে, ফুটবল কর্তাদের নিন্দা-মন্দের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। সর্বোপরি এই গোলের সুবাদে বাংলাদেশ আজ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মূল পর্বে।

বলা হচ্ছে রবিউল হাসানের গোল কাহিনি। গত জুনে লাওসের বিপক্ষে তাঁর অ্যাওয়ে গোলটির কাছে বাংলাদেশ ফুটবলের ঋণের শেষ নেই। প্রাক-বিশ্বকাপ বাছাইয়ে খেলা ছিল লাওসের সঙ্গে, আশা-আকাঙ্ক্ষা আর উত্কণ্ঠার মোড়কে বাঁধা ম্যাচ দুটির গর্ভে লুকিয়ে ছিল ফুটবলের ভবিষ্যৎ। ‘হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে’ ম্যাচ দুটির হার্ডল জয়ে পার করা গেলে আলোকিত হবে ফুটবল, নইলে তলিয়ে যাবে আরো তিমিরে। লাওসের মাঠে গিয়ে অ্যাওয়ে ম্যাচ জেতে বাংলাদেশ রবিউলের গোলে। এরপর হোম ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হলেও তরুণ মিডফিল্ডারের ওই গোলে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে। তবে কীর্তিমানের কণ্ঠে গৌরবের অত মাখামাখি নেই, বরং দলগত খেলার জয়গান করছেন, ‘এই গোলের কথা আমার অনেক দিন মনে থাকবে। আমাদের দল এখন ভালো ফুটবল খেলে, সবাই মিলে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে। এবার লিগেও জাতীয় দলের অনেকে গোল পেয়েছে। ধারাটা বজায় থাকলে আমরা বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেও ভালো করব।’ বাছাই পর্ব শুরু হবে আগামী মাসে, তবে বাকি চার দলই অনেক শক্তিশালী। ‘ই’ গ্রুপে বাংলাদেশ লড়বে ওমান, ভারত, আফগানিস্তান ও কাতারের বিপক্ষে।

এখন থেকে লাল-সবুজের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখা যায় না। সবার মতো রবিউলও এটা মনেন, তবে ঘরের মাঠে কয়েকটি ম্যাচে নিজেদের সেরাটা দিয়ে তো চেষ্টা করা যায়, ‘গ্রুপের প্রতিপক্ষ অনেক শক্তিশালী, এটা সত্য। তবে এএফসি অনূর্ধ্ব-২৩ ফুটবলে কাতারকে হারিয়েছিলাম আমরা। ফুটবলে আগে থেকে কিছু বলা যায় না। নিজেদের মাঠে দু-তিনটি ম্যাচে দুর্দান্ত লড়াই করে যদি জয় কিংবা ড্র করা যায়…।’ গত পাঁচ-ছয় বছরে দলের ভেতরে এমন সাহস ও চিন্তার প্রবাহ খুব দেখা যায়নি। যেন চরিত্র বদল হচ্ছে ফুটবল দলের। সিনিয়রদের বিদায়ে এবং তারুণ্যের আগমনীতে নতুন সুর বেজে উঠছে লাল-সবুজের ফুটবলে। যেমন জাতীয় দলে রবিউলের ক্যারিয়ার মাত্র পাঁচ ম্যাচের, এরই মধ্যে দুই গোল করে নতুন ভরসার মানুষ হয়ে উঠেছেন এই মিডফিল্ডার। হয়ে উঠেছেন জাতীয় দলের ইংলিশ কোচ জেমি ডের প্রিয়পাত্র, ‘রবিউলের প্রতিভা আছে। পায়ে ড্রিবলিং আছে, মাঝমাঠে খেলাটা গোছাতে পারে। বিশেষ করে অ্যাটাকিংয়ে সে খুব ভালো।’ এই মিডফিল্ডার মনে করছেন কোচের সঙ্গে তাঁর পারস্পরিক বিশ্বাস অনেক বেড়েছে, ‘লাওসের সঙ্গে দুটি ম্যাচে আমি বদলি হয়ে খেলেছি। ম্যাচের আগের দিন কোচ বলেছিলেন, খেলার সুযোগ পেলে যেন শেষ মিনিট পর্যন্ত মনঃসংযোগ ধরে রেখে খেলি। আমিও সেভাবে খেলার চেষ্টা করি, তাতে মনে হচ্ছে কোচের অনেক আস্থা আমার ওপর।’

২০ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারে আস্থার সূত্রপাত আরামবাগ ক্রীড়া সংঘে। এখানে তিনটি মৌসুমে কাটিয়ে টাঙ্গাইলের এই ফুটবলার শিখেছেন অনেক কিছু। তাই এই ক্লাব এবং কোচ মারুফুলের কাছে তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, ‘দিলকুশায় তৃতীয় বিভাগ খেলে আমি সরাসরি প্রিমিয়ারের দল আরামবাগে নাম লেখাই। এখানে না এলে হয়তো আমার ক্যারিয়ার এ রকম হতো না। গত দুই বছর মারুফ স্যারের কাছে যা শিখেছি, তা দিয়েই আমি এখন ফুটবল খেলছি। আরামবাগে তিনি খেলাতেন আমাকে ফ্রি-প্লেয়ার হিসেবে, যেভাবে খেলতে চাই, সেই স্বাধীনতা আমাকে দিয়েছিলেন। খেলাটা আমি উপভোগও করেছি। আমার ক্যারিয়ারে আসলে মারুফ স্যারের অনেক অবদান।’ তৃতীয় বিভাগ খেলে দুই বছর আগে প্রিমিয়ারে নাম লেখালেও তাঁর খেলাটা বেশি চোখে পড়েছে গত লিগে। সুবাদে লিগের সেরা উদীয়মানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। তবে ফিরতি লেগে চার ম্যাচ বাদে দলের স্কোয়াডে তাঁর অনুপস্থিতি ছিল রহস্যে ঘেরা। এমন খেলোয়াড়কে স্কোয়াডের বাইরে রেখেই লিগ শেষ করেছে আরামবাগ! রবিউল বলছেন চোটের কথা, ‘রহস্যের কিছু নেই। আমার ডান পায়ের অ্যাংকেলে চোট পাওয়ায় আর খেলতে পারিনি।’ আরামবাগে তিন মৌসুমের চুক্তি শেষে শুরু হয়েছে তাঁর নতুন ভাবনা। বড় হয়েছে তাঁর স্বপ্ন, ক্লাব ও জাতীয় দলে তাঁর পারফরম্যান্স যেন তাঁকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জের দিকে, ‘আরামবাগে আমি খেলা শিখেছি, আগামী মৌসুমে আরো বড় দলে খেলতে চাই। বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে চাই।’ বড় চ্যালেঞ্জের বড় দল কি বসুন্ধরা কিংস? এড়িয়ে গিয়ে মিডফিল্ডার আবার ফিরে গেছেন লাল-সবুজে, ‘দলবদলের সময় এলে সবাই জানবে। তার আগে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের বড় চ্যালেঞ্জ আছে। ওখানে ভালো খেলতে হবে আমাকে।’

তাঁর যে গোলে হয়েছে বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণ, সেখান থেকেই আবার শুরু রবিউলের।