বিশ্বের বহু দেশে কারাগারে ঈদ করছেন বিরোধী দলীয় নেতারা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন বিরোধী দলীয় নেতার এবারের ঈদ কাটবে জে’লে। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযুক্ত হলেন পাকিস্তানের বিরোধী দল পাকিস্তান মু’সলিম লিগ নেতা মা’রিয়াম নাওয়াজ।

গত ৮ আগস্ট ২০১৯, বৃহস্পতিবার লাহোরের কোর্ট লাখপাত জে’লে বন্দী তাঁর বাবা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাওয়াজ শরীফের সাথে সাক্ষাৎ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাকে বন্দী করা হয়। পাকিস্তানের দূর্নীতি দমন সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো আ’দালতে নাওয়াজ শরিফের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান চৌধুরী চিনি কল সংক্রন্ত দূর্নীতি ও অর্থ পাচার মা’মলা দায়েরের প্রেক্ষিতে মা’রিয়াম নাওয়াজ ও তার চাচাত ভাই ইউসুফ আব্বাসকে আ’ট’ক করা হয়।

শুক্রবার ২১ আগস্ট ২০১৯ পর্যন্ত তাদের রি’মান্ড মঞ্জুর করেন। তাই ঈদে কারাগারেই থাকতে হচ্ছে পাকিস্তানের বিরোধী দলের মূল নেতা নাওয়াজ শরীফ ও তার কন্যা বর্তমানে বিরোধী দলীয় নেতা মা’রিয়াম নাওয়াজকে।

ফেব্রুয়ারী ২০১৮ কারাগারে আছেন বাংলাদেশের সরকার বিরোধী জাতিয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতা বেগম খালেদা জিয়া। জিয়া চেরিটেবল ট্রাস্ট সংক্রান্ত দূর্নীতি মা’মলায় ৭ বছরের কারাদ’ন্ড হওয়ায় তিনি জে’লে বন্দী হন। আ’দালতের আদেশে স্বেচ্ছায় কারাব’ন্দি হন খালেদার দীর্ঘ দিনের গৃহবন্দী ফাতেমা। তাই ফাতেমাকে নিয়ে জে’লেই কা’টাবে খালেদার ঈদ। তবে অ’সুস্থার কারনে বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় হাসপাতালের বিশেষ কক্ষে থাকবেন। এই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, যা জে’ল হিসাবে গন্য। গত রমজান মাসে তাকে নিম্নমানের ইফতার পরিবেশনের অ’ভিযোগ উঠলেও সরকার তা অস্বীকার করে। ঈদে সকল বন্দীর মত তাঁকেও উন্নত মানের খাবার দেয়া হবে।

৩ এপ্রিল ২০০৯ থেকে ১০মে ২০১৮ পর্যন্ত টানা ৯ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নাজিব রাজ্জাক। মালয়েশিয়ার কিংবদন্তী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহাথীর মোহাম্ম’দকে গুরু মানতেন নাজিব রাজ্জাক। কিন্তু দু’র্নীতির অ’ভিযোগ ওঠায় তাঁর প্রতি বিরাগভাজন হন মাহাথীর। ফলে এককালে মাহাথীরের বিরাগভাজন ও কারাবন্দী নেতা আনোয়ার ইব্রাহীমের সঙ্গে জোটবন্ধ হয়ে নির্বাচন করেন মাহাথীর মোহাম্ম’দ। ৯মে ২০১৮ তারিখের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হন মাহাথীর। এরপর নাজিব রাজ্জাকের বি’রুদ্ধে একে কে দু’র্নীতির অ’ভিযোগ দায়ের ও বিচার শুরু হওয়ায় কার্যত বন্দী হয়ে পড়েন ধনাঢ্য নাজিব রাজ্জাক। ব্যক্তিগত একাউন্টে অস্বাভাবিক তহবিল, সরকারী ব’ন্ড ও ফাণ্ডের টাকা ব্যক্তিগত একাউন্টে রাখা এবং নিজ বাসস্থানে মূল্যবান অলংকার ও ধন সম্পদের পাহাড় সৃষ্টি করায় নাজিবের বি’রুদ্ধে মালয়েশিয়ার দু’র্নীতি দমন কমিশন মা’মলা দিতে থাকে। ধারণা করা হয় তাঁর বি’রুদ্ধে নিশ্চিত প্রমাণিত অ’প’রাধের দায়ে বিভিন্ন মা’মলায় ১০০ বছর পর্যন্ত জে’ল হতে পারে নাজিব রাজ্জাকের। এসব চলমান মা’মলায় বন্দী, রি’মান্ড, নজর বন্দী, বেইল ইত্যাদির মধ্যদিয়ে দিন কাটলেও সার্বিক বিচারে বলা যায় এক ধরণের বদনী অবস্থায় ঈদ কা’টাবেন নাজিব রাজ্জাক।

এবছর ২০ ফেব্রুয়ারি অর্থ পাচারের মা’মলায় আ’ট’ক হন মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং প্রগ্রেসিভ পার্টি অব মালদ্বীপের নেতা ইয়ামেন আবদুল গাইয়ুম। ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মালদ্বীপ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা ইব্রাহিম মোহাম্ম’দ সোলিহ’র কাছে অ’প্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হন আবদুল্লাহ ইয়ামেন। এরপর তাঁর বি’রুদ্ধে মালদ্বীপের সরকারী প্রতিষ্ঠান মালদ্বীপ মা’র্কেটিং ও পাবলিক রিলেশনস করপোরেশনের ১৩০০ মিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অ’ভিযোগ ওঠে। ফলে ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আ’দালতের আদেশে মাফুসী জে’লে পাঠান হয় প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও বিরোধী দলীয় নেতা আবদুল্লাহ ইয়ামেনকে।

মিশরের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার রাজবন্দী রয়েছেন যারা এক কালের সেনাবাহিনী প্রধান এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি ক্ষমতা গ্রহনের পর বন্দী হন। এদেরই একজন মিশরের বিরোধী দল সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং সিভিল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের নেতা জাইয়াদ এলিলামি। ২০১১ সালে মিশরের দীর্ঘদিনের শাসক হোসনি মোবারকের বি’রুদ্ধে গণ আ’ন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ফাতেহ।

এরপর অনেক নাট’কী’য়তার পর ২০১৪ সালের ২৬ ও ২৮ মে তে বিতর্কিত নির্বাচনে ৯৬ শতাংশ ভোটে নির্বাচিত হন সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। তিনি নির্বাচিত হবার আগেই নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ মোরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এরপর তাঁকে অ’পহরণ ওপরে ব’ন্দি করা হয়। এবছর ১৭ জুন বিচার চলাকালে মৃ’ত্যুবরণ করেন মোরসি, যা সন্দেহ’জনক বলে প্রচারিত।

২০১৫ সাল থেকে জে’লে আছেন বাহরাইনের সরকার বিরোধী আল উইফাক আ’ন্দোলনের নেতা শেখ আলী সালমান। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে বাহরাইনের হাইকো কূটনৈতিক স’ম্পর্ক ছেদ করা দেশ কাতারের সাথে গো’পন স’ম্পর্ক রাখা, গুপ্তচরবৃত্তি এবং রাষ্ট্রদ্রোহতার অ’ভিযোগে সালমানকে যাব’জ্জীবন কারাদ’ণ্ড প্রদান করে।

রাজনীতি নিষিদ্ধ তথা রাজতন্ত্রের বহু আরব দেশ, যু’দ্ধবিদ্ধস্ত মু’সলিম দেশসহ উপসাগরীয় বহুদেশের কারাগারে রয়েছেন কয়েকশত বিরোধী নেতা।

লেখক- প্রাক্তন সেনা কর্মক’র্তা ও গবেষক মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অবঃ) পিএইচডি।